বিদেশে ক্রেডিট কার্ডে খরচ কমেছে, বেড়েছে দেশে
মাস ব্যবধানে ক্রেডিট কার্ডে বিদেশি মুদ্রার লেনদেন কমলেও অভ্যন্তরীণ লেনদেন বেড়েছে। দেশের বাইরে ক্রেডিট কার্ডে সবচেয়ে বেশি অর্থ খরচ করা হয় ডিপার্টমেন্টাল স্টোর, খুচরা দোকান ও ফার্মেসিতে। আর দেশের বাইরে খরচে বাংলাদেশের ব্যবহারকারী সবচেয়ে বেশি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করেন ভারতে। এর পরে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্র।
বাংলাদেশে ইস্যু করা ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার নিয়ে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সাম্প্রতিক এক গবেষণায় এ তথ্য উঠে এসেছে। গবেষণায় দেশে ও দেশের বাইরে ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহারের তথ্য তুলে ধরা হয়েছে। পাশাপাশি দেশের ভেতরে যেসব বিদেশি ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করা হয়, তার তথ্যও তুলে আনা হয়েছে গবেষণায়।
ক্রেডিট কার্ড ইস্যুকারী দেশের ৪৩টি ব্যাংক ও ১টি ব্যাংক-বহির্ভূত আর্থিক প্রতিষ্ঠানের বিপুল তথ্য-উপাত্ত ব্যবহার করে বাংলাদেশ ব্যাংকের পরিসংখ্যান বিভাগ এ গবেষণা প্রতিবেদন তৈরি করে।
গত আগস্টে কার্ডের মাধ্যমে দেশি মুদ্রা লেনদেন হয়েছে ৪০ হাজার ৩৬৩ কোটি টাকা। আগের মাস জুলাইতে যা ছিল ৩৬ হাজার ৯০০ কোটি টাকা। মাসের ব্যবধানে লেনদেন বেড়েছে সাড়ে ৮ শতাংশ।
আলোচিত সময়ে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন কমেছে ৩ দশমিক ১ শতাংশ। জুলাই মাসে ক্রেডিট কার্ড ব্যবহার করে ২ হাজার ৬৭৪ কোটি টাকার লেনদেন হয়েছিল। কিন্তু আগস্ট মাসে তা কমে দাঁড়িয়েছে ২ হাজার ৫৯১ কোটি টাকায়। অর্থাৎ লেনদেন কমেছে ৮৩ কোটি টাকা।
তবে ক্রেডিট কার্ডে লেনদেন কমলেও সামগ্রিকভাবে কার্ডে লেনদেন বেড়েছে। গত আগস্ট মাসে সব ধরনের কার্ড ব্যবহারে সর্বমোট লেনদেন হয়েছে ৪১ হাজার ২১ কোটি টাকা। আগের মাস জুলাইতে লেনদেন হয়েছিল ৩৭ হাজার ৬৭০ কোটি টাকা। সে হিসাবে মাসের ব্যবধানে কার্ডের মাধ্যমে লেনদেন বেড়েছে ৮ দশমিক ৮৯ শতাংশ।
আর দেশের বাইরে লেনদেনের ক্ষেত্রে সবচেয়ে বেশি ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার হয়েছে ভারতে। এর পরিমাণ ১৭ দশমিক ৬২ শতাংশ, অর্থের হিসাবে যা ৭৩ কোটি ৭০ লাখ টাকা। এ ছাড়া লেনদেনে অন্যান্য দেশ হিসাবে রয়েছে যুক্তরাষ্ট্রে ১৬ দশমিক ৩২ শতাংশ, থাইল্যান্ডে ৯ দশমিক ৫১, যুক্তরাজ্যে ৭ দশমিক ৬৯, সিঙ্গাপুরে ৭ দশমিক ৬১, কানাডায় ৬ দশমিক ৭১, সংযুক্ত আরব আমিরাতে ৬ দশমিক ৪৯, মালয়েশিয়ায় ৫ দশমিক ৪০, সৌদি আরবে ২ দশমিক ৮৯, নেদারল্যান্ডসে ২ দশমিক ৮১, আয়ারল্যান্ডে ২ দশমিক ৭৩, অস্ট্রেলিয়ায় ২ দশমিক ১৯ ও অন্যান্য দেশে ১২ দশমিক ২ শতাংশ।
পর্যালোচনায় দেখা যায়, গত জুলাই মাসে ডেবিট কার্ড ব্যবহার করে লেনদেন হয়েছে ৩৪ হাজার ৪৫৬ কোটি টাকা। আগস্ট মাসে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৭ হাজার ৮০৩ কোটি টাকা। অর্থাৎ মাসের ব্যবধানে ডেবিট কার্ড ব্যবহার করে লেনদেন বেড়েছে ৩ হাজার ৩৪৭ কোটি টাকা বা ৯ দশমিক ৭১ শতাংশ।
আর জুলাই মাসের তুলনায় আগস্টে প্রি-পেইড কার্ডে লেনদেন বেড়েছে ১৮ দশমিক ৬৪ শতাংশ। গত জুলাইতে প্রি-পেইড কার্ড ব্যবহার করে লেনদেন হয়েছিল ৩০০ কোটি টাকা। আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩৫৬ কোটি টাকা।
ব্যাংকাররা জানায়, সঙ্গে করে নগদ টাকা বহনের ঝুঁকি বিবেচনায় গ্রাহকদের অনেকে কার্ড ব্যবহারে স্বাচ্ছন্দ্য বোধ করেন। আবার শাখায় গিয়ে লাইন ধরে লেনদেন করতে বাড়তি সময় লাগে। এ ছাড়া ব্যাংকিং সময়ের বাইরে যেকোনো লেনদেনের সুবিধার কারণে এখন কার্ড লেনদেনে মানুষের আগ্রহ বাড়ছে।
চলতি বছরের আগস্টে দেশে ডেবিট, ক্রেডিট এবং প্রি-পেইড কার্ড ইস্যুর পরিমাণও বেড়েছে। গত জুলাই মাসে দেশে ইস্যুকৃত ডেবিট কার্ডের পরিমাণ ছিল ৩ কোটি ২৬ লাখ ৬৬ হাজার ৫০৭টি। আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৩ কোটি ৩১ লাখ ৫৬ হাজার ৯১০টি। আর আগস্টে ক্রেডিট কার্ডের পরিমাণ দাঁড়িয়েছে ২২ লাখ ৯৪ হাজার ৪৯১টি। আগের মাসে যা ছিল ২২ লাখ ৬৮ হাজার ৩৭১টি। এ ছাড়া গত জুলাই মাসে প্রি-পেইড কার্ডের পরিমাণ ছিল ৪৪ লাখ ৯ হাজার ৭১২টি। মাসের ব্যবধানে আগস্টে তা বেড়ে দাঁড়িয়েছে ৪৫ লাখ ৯০ হাজার ৮৪২টি।
ক্রেডিট কার্ড সেবাকে জনপ্রিয় করে তুলতে নানা ছাড় এবং সুযোগ-সুবিধা দিচ্ছে ব্যাংক এবং আর্থিক প্রতিষ্ঠানগুলো। প্রথম বছরে ফ্রি সেবা, নির্দিষ্টসংখ্যক লেনদেনে প্রতি বছর বাড়তি চার্জ মওকুফ, রিওয়ার্ড পয়েন্ট সুবিধা, বিভিন্ন ব্র্যান্ডের পণ্য কেনাকাটায় বিশেষ ছাড়, হোটেলে থাকা এবং খাওয়াসহ নানা অফার। এতে ক্রেডিট কার্ডের ইস্যু করার পরিমাণ দিনদিন বাড়ছে। কিন্তু ডলার সংকটসহ নানা কারণে এর লেনদেন কমছে।
দেশের মধ্যে ব্যবহার করা ক্রেডিট কার্ডের ধরন বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এতে দেখা যায়, ক্রেডিট কার্ডের ব্যবহার বেশি হয়েছে দেশের ডিপার্টমেন্টাল স্টোরে। মোট ক্রেডিট কার্ড লেনদেনের ৫০ শতাংশ অর্থাৎ অর্ধেক লেনদেন হয়েছে ডিপার্টমেন্টাল স্টোরগুলোয়। এ ছাড়া ১২ দশমিক ৩৪ শতাংশ খুচরা দোকানের ক্ষেত্রে, ৯ দশমিক ১৬ শতাংশ ইউটিলিটি, ৭ দশমিক ৯৭ শতাংশ নগদ অর্থ উত্তোলন, ৫ দশমিক ৯৫ শতাংশ ওষুধ এবং ফার্মেসিতে, ৪ দশমিক ৫১ শতাংশ পোশাক কেনাকাটায়, ৩ দশমিক ৪৪ শতাংশ লেনদেন হয়েছে ফান্ড ট্রান্সফারে, ৩ দশমিক ৩৭ শতাংশ ট্রান্সপোর্টেশন, ২ দশমিক ১৮ শতাংশ ব্যবসা সেবা ও ১ দশমিক ৯ শতাংশ ক্রেডিট কার্ডের লেনদেন হয়েছে অন্যান্য প্রয়োজনে।
লেনদেনে কার্ডের ধরন বিশ্লেষণে দেখা যায়, ভিসা কার্ডের মাধ্যমে সবচেয়ে বেশি লেনদেন হয়েছে এই সময়ে। এর পরিমাণ ৭৭ দশমিক ৪৫ শতাংশ। এর পরেই রয়েছে মাস্টার কার্ড, এই কার্ডের মাধ্যমে লেনদেনের পরিমাণ ১৪ দশমিক শূন্য ৪৯ শতাংশ। এ ছাড়া বাকি প্রায় ৮ দশমিক ৬ শতাংশ লেনদেন হয়েছে অন্যান্য কার্ডের মাধ্যমে।







